Showing posts with label প্রেম. Show all posts
Showing posts with label প্রেম. Show all posts

September 13, 2014

প্রেমের গল্প / নীল আলোর ফুল / অঞ্জন কুমার দাস

শরৎ এখন। স্টেশনের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকের যে রাস্তাটি চলে গেছে দূরে, শ্মশানের দিকে। শ্মশান পেরিয়ে কবরস্থান।  শমিত ও রণিতা  শেষ পর্যন্ত  এসে দাঁড়ায় কবরস্থানের পাশ দিয়ে সরু রাস্তাটির শেষ যেখানে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তার মজা খাল।  বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে ধুলোবালি।  পরিবেশ সতেজ। দুজন দুজনের চোখে তাকায়। রণিতা চোখ নামিয়ে নেয়।

শমিতের সামনে রুণু তুলে ধরে সেই পুরনো ডায়েরীটি। শমিত ডায়েরীটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে, পৃষ্ঠা ওল্টায় না। শুধু পেছনের মলাটটি উল্টে গেলে দেখে ‘‘জন্মদিনে বন্ধুকে, বন্ধুতার স্মারক, — শমিত।’’ শমিতের মনে পড়ে।  শমিত  পুলকিত হয়। রণিতাকে দেখে, অবাক হয়।

অনেক দিনের চেনা বন্ধু দুজন। আড্ডা মেরেছে সব একসাথে, বন্ধুরা। তুই-তোকারি সম্পর্ক। আজ যেন দুজনেই দুজনার কাছে কত নতুন ! এই বুঝি প্রেমের আশ্চর্য রসায়ন!  শমিত  আশ্চর্য হয়ে দেখে,  রণিতা  যেন এক নীল আলোর ফুল। শমিতের  মোবাইলে প্রিয় রিংটোনটি বেজে ওঠে।  রণিতা  তর্জ্জনী তুলে দেখায়, খুব কাছে দুটি  নতুন কবর।  শমিত  কলটা রিসিভ করে না। বাজতে থাকে।

রণিতা  বলে, শমি তোমার এই রিংটোনটা শুনলে মনে হয়, শত শত যুদ্ধবাজ বীর সৈনিকের মৃতদেহ যেন সরে সরে যাচ্ছে চোখের সামনে দিয়ে সমবেত বিউগল বাজনার মধ্য দিয়ে। যেন যুদ্ধ শেষ জীবনের, স্বগোতোক্তির মতো উচ্চারণ রণিতার। অবাক হয়  শমিত, বিষন্ন হয়। বদলে দিতে চায় রিংটোনটি।

রণিতা বলে, থাক্। এই বিষন্নতা হলুদ প্রজাপতির দুঃখের মতোই একান্ত। দুঃখই তো একমাত্র যা মানুষকে নিভৃতে সঙ্গ দেয়।
নীলার সঙ্গে কোথায় যেন খুব মেলে রণিতার। জিনসের উপর বুটিকের হলুদ কুর্তা। শমিতের  খুব ইচ্ছে রণিতার পিঠের সেই জরুল চিহ্নটি ছুঁয়ে দেয়।

রণিতার মোবাইল বেজে ওঠে।  অফিসের বস্। কাল ছুটতে হবে শিলিগুড়ি।  শমিত  তর্জনী  দিয়ে রণিতার জরুল চিহ্নটা ছুঁয়ে দেয়,  রণিতা চমকে ওঠে।  কিছু বলে না। সোনালী বিকেলের আলো রণিতার পিঠে।  রণিতা  মোবাইলে কথা বলতে থাকে। আদুরে ধমকের সুরে বলে —  হচ্ছেটা কি ?  শমিত  হাত সরায় না।

শমিত  হাত সরিয়ে নেয়,  রণিতা  পেছন ফিরে তাকায়। রণিতার ভালো লাগছিল একজন পুরুষের  নিরেট নির্ভার ছোঁয়া।
শমিত  মনে মনে বলে, এই তো  সেই অনাদিকালের মেয়ে, যাকে সে চায়। মোবাইলে কথা ফুরোয় রণিতার।

সোনালী আলো ফুরিয়ে আসছে।  হঠাৎ একটি লোক পেছন থেকে হেঁকে ওঠে।  রণিতা  চমকে ওঠে।
— বাবু আপনারা কারা ? কোথা থেকে এসেছেন ? এখানে তো কেউ আসে না।  আমাদের দিকে তাকায় সন্দিগ্ধ চোখে।  লোকটি উত্তরের অপেক্ষা না করে খুব নির্লিপ্তভাবে বলে, মেয়েমানুষের সঙ্গে ভর সন্ধ্যেবেলায় এখানে থাকবেন না। গতকালই এখানে এই দুটি কবর দেওয়া হয়েছে। পাশের গায়ের দুটি জোয়ান ছেলে-মেয়ে।
 শমিত  বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, একই দিনে দুটি কবর!
— হ্যাঁ, প্রধান, আলী হোসেনের মেয়ে, আর রিক্সাওয়ালা রহমত চাচার কলেজে পড়া ছেলে। লোকটির গলা আড়ষ্ঠ হয়ে আসে।  শমিত  কথা বাড়ায় না। লোকটি গরু নিয়ে হেঁটে এগিয়ে যায়।

চুপচাপ দুজন। নিবির সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকে রণিতা।  বাইকের উপর কাগজে মোড়া গোলাপের তোড়াটি শমিত রণিতাকে দেয়।  রণিতা  খুব যতœ করে তা নেয়। বুকের কাছে নেয় ফুলের তোড়াটি। গোলাপের  কাঁটাগুলিতে হাত বোলায় রণিতা।  তাজা গোলাপের তোড়াটি রণিতা দুটি কবরের মাঝখানে রেখে আসে। শমিত রণিতার পেছনে এসে দাঁড়ায়।

— ভালোবাসা বুঝি এরকমই। শুধু দুঃখ দিতে জানে। সুখ অতি সামান্যই। মণিকাঞ্চন বিদ্যুৎচ্ছটার মতো —  রণিতা  বলে।
— হ্যাঁ, ঠিক তাই।
—  শমিত, তুমি কি আমার জীবনের সবটুকু জানো ? দৃঢ়, আবেগহীন গলা রণিতার।


শমিতের দৃপ্ত উচ্চারণ — রণিতা । তুমি তো আমাকে চেন। জানো আমি দ্বিধাহীন, সপাট। আর তুমি যা জানতে চাইছ, তা খুব সহজ করে বলছি — ‘ভার্জিনিটি ইজ অ্যা স্টেট অব মাইন্ড’।   

রণিতা নরম হয়। তার চোখ মুখে ফুটে ওঠে এক দীপ্ত বিভা। শমিত তা টের পায়। সন্ধ্যা হয়নি এখনও। যদিও মেঘেরা বাড়ি ফিরছে। চাঁদ উঠছে আলতো করে।

দাগ, ২০১৩

September 9, 2014

গল্প / হেয়ারপিন : নিশিকান্ত সিনহা

প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছোট্ট মেলা।
পুজো উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও মেলা বসেছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, হাল্কা গোলাপী রঙের ছাপা শাড়ি, ম্যাচিং ব্লাউজ আর নিটোল দুখানা হাত। হাতে সরু দুখানি চুড়ি। মাথায় একরাশ চুল, এলোমেলো খোঁপা বাঁধা। দেখতে খুব খারাপ না। মুকুল দেখছিল মেয়েটিকে।
মুকুলের ছোট্ট মনোহারী দোকানের জিনিসপত্র খুঁটিয়ে দেখছিল মেয়েটি। কী কিনবে ভেবে পাচ্ছিল না হয়তো। দোকানটা খুব সুন্দরভাবে সাজিয়েছে তার।  যদিও দুইদিনের মেলা, তবুও মাঠের মধ্যে সার সার সাজানো অন্যান্য মনোহারী দোকানগুলোর তুলনায় তার দোকানটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মেলার প্রথম দিন ভাল বিক্রিবাট্টা হয়েছে কিন্তু এই মেয়েটি ভাবতে ভাবতে মুকুল পিছনে রাখা টিনের বড় ট্রাঙ্কের গায়ে হেলান দিয়ে বসল।

September 8, 2014

প্রেমের চিঠি / হৃদয়ে শব্দহীন জ্যোৎস্না : অঞ্জন কুমার দাস

◌◌◌ এক ◌◌◌

তারিখ : ২৫শে বৈশাখ ১৪০৮

নীলাঞ্জয়ী,
আমি তো তেমন কবি নই। কবিতার অবয়বে আমার চলা ফুরায় না। সেই অপূর্ণ হৃদয়ের না বলা কথামালা নিয়েই এলোমেলো ভাবে সাজাচ্ছি আমার এই অলৌকিক নির্মাণ। কতটা  অর্থবহ হয়ে উঠবে জীবনের ধ্বনি, আমার শব্দবান্ধবেরা... তা এখনো অলীক।

কি লিখি তোমায়, রাত্রি। কি লিখি তোমায়? ভাবনার গহ্বর যে খালি হতে জানে শুধু। ক্কচিৎ বাষ্পে ভরপুর হয়। এই যে জীবনের কাছে মহাঋণ  নিয়ে এসেছি পৃথিবীর বুকে। এই জলের জীবন এই সংশয়ের জীবনে বেঁচে থাকাই শুধু সব নয়। শুধু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা মৃত্যুর অপেক্ষার মতো নীল কিছু। বরঞ্চ পরস্পর যৌথ খামার গড়ি। ভালোবাসার আঙুর সবাই মিলে চটকে শ্যাম্পেনের বোতলে পুরি অভিনব সম্ভাবনা।  ভালোবাসার মতো কি আছে এই জীবনে? ভালোবাসাই তো বেঁচে থাকার অফুরান জীবনীশক্তি।

কিসের জন্য এই অহংয়ের সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে প্রশস্ত পথের দিকে যেতে চাওয়া আমার।  কত কি রয়েছে লেখা জীবনের ভেতর। সব কিছু বলার জন্য মাথা নুইয়ে আছি সাদা পৃষ্ঠার দিকে। কলমের কালির রেখা শুধু এঁকে-বেঁকে যাচ্ছে। কিছুই বলা হচ্ছে না বলার মতো।

এই যে এত সাহস নিয়ে এসেছি তোমার বুকের ডান পাশে। অভিমানে ফুলে ওঠা ঠোঁটের ওপর। সব সমর্পণের মতো বলে যাবো নিজের কাছে, রাত্রিলেখা নীলাঞ্জয়ী। একজন যথার্থ প্রেমিকের মতো আমি চেয়েছি তোমার সুখ।  তাই এতদিন বাদে, এতকাছে এসে পেতেছি করপুট। দাও হে, দাও কিছু . . . প্রেমের স্মারক চিহ্ন কিছু।

September 6, 2014

গদ্য / আমার প্রেম / বিনয় ভূষণ বেরা


প্রেম করা সই আমার হল না
আজি হইতে প্রায় চল্লিশ বৎসর পূর্বের কথা বলিতেছি। আমি তখন ষষ্ঠবর্ষীয় বালকমাত্র। বিদ্যালয়ের প্রথম সারির বেঞ্চে বসিয়া দ্বিতীয় পিরিয়ড-এর মধ্যবর্তী শিক্ষকবিহীন সময়টিতে গাহিয়া উঠিলাম—  ‘আষাঢ় শ্রাবণ   মানে নাত মন। মণিহার চলচ্চিত্র তখন বাজারে হিটকরিয়াছেতাহার গান লোকের মুখে মুখে। শুনিয়া শুনিয়া আমিও দু-এক কলি রপ্ত করিয়া ফেলিয়াছিলাম। চক্ষু মুদিত করিয়া সংগীত সাগরে নিমগ্ন হইয়াছিএক ধাক্কায় চটক ভাঙিয়া গেল। আমার সমপাঠী প্রসাদ আমার চাইতে এক বৎসরের বড়। আমরা বলিতাম পেসাদ’, আমাকে সতর্ক করিতেছেজানিস এসব প্রেমের গান, ইসকুলে গাইতে নাই। যতদূর স্মরণ করিতে পারি প্রেমশব্দটির সহিত সেই আমার প্রথম পরিচয়। শুনিলাম কিন্তু হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিলাম না। স্পষ্ট বুঝিলাম অজ্ঞাতসারে এক নিষিদ্ধ আঙিনায় অনধিকার পদার্পণ করিয়াছি, শঙ্কিত  বক্ষে নিজেকে সংবৃত করিলামনা জানি কী মারাÍক ব্যাপার ঘটিয়া যায়!
আজিকার তরুণ পাঠকপাঠিকাগণ ভাবিতে  পারেনএই সামান্য ব্যাপারে এত ভ্যানতাড়া কিসের’ ? তাঁহাদের স্মরণ করাইয়া দিবচল্লিশ-পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে চলচ্চিত্র, দূরদর্শন সিডি-ডিভিডির এমন দৌরাত্ম্য চালু হয় নাই। তিন বৎসরেরর শিশুর মুখে দিল’ ‘প্যারশব্দের হরবখ্ত প্রয়োগ অকল্পনীয় ছিল এবং স্কুলছাত্রের পক্ষে প্রেমশব্দটির উচ্চারণও ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসপ্রযুক্ত।

গদ্য / কত কী রয়েছে লেখা... / সৌমিত্র চক্রবর্তী


‘‘হয়ত কথাটা জানাতে দেরি করে ফেলেছি, কোনটা সঠিক সময় ছিল সেটা আজও বুঝে উঠতে পারি নি। কিন্তু তুমি বিশ্বাস কর, সেই সব মুহূর্তগুলিতে যখন তুমি আমার সঙ্গে ছিলে . . . ., ’’ পঁয়ত্রিশবার এই ভাবেই শুরু করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। শুধু মাত্র একটা ভয়, যেটা সবাইকে বুঝিয়ে বলা যায় না, আবার বলার দরকারও হয় না।

এই একুশ-বাইশ বছরের জীবনে হয়ত একুশ-বাইশবার প্রেমে পড়েছি, কোনোটা এক মিনিটের জন্য তো কোনোটা ... ..., কিন্তু কোনো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একুশ হাজার বার ভেবে ফেলেছিলাম। ফল ... ? ঐ পঁয়ত্রিশবার লিখে ছিঁড়ে ফেলা— ‘‘হয়ত কথাটা জানাতে দেরী করে ফেলেছি ... ’’  তাই এটা নিশ্চিত যে, প্রেমে বেশী ভাবনা চিন্তা প্রেমের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তাও কী সম্ভব ? প্রেম উইদাউট চিন্তা ভাবনা ? প্রশ্নটাই অর্থহীন। যেটা প্রেমের অন্যতম অনুভূতির একটা, তাকে বাদ দিয়ে অসম্ভব। আর এই ক্ষেত্রে চিন্তা ভাবনা যে সব বস্তুর চারপাশে ঘোরাফেরা করে তা হলপ করে বলা যায় প্রেমের স্থান-কাল-পাত্রযেগুলো প্রেমের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। এর কোন অংশে কম নয়। আর আমাদের মতো মফস্বল এলাকাতে তো এগুলোই সব সুবিধা-অসুবিধার প্রাণকেন্দ্র। তিনটির মধ্যে একটি বিরূপ হলে প্রেমের খাতায় গোল্লা ছাড়া উপায় নেই। আর আমার ক্ষেত্রে ঐ তিনটে বস্তু ? ঘটনার বর্ণনা করছি :

গদ্য / প্রেমের স্বরূপ / অরুণেশ্বর দাস


 প্রেম শব্দ এক অসাধারণ শব্দ। সাধারণ অর্থে অতি সাধারণ অর্থ দাঁড়ায়। ব্যপক অর্থে দাঁড়ায় অসাধারণ অর্থ। ব্যাপক অর্থে প্রেম সর্বব্যক্তিতে, সর্ববস্তুতে, এমনকি সাধারণ দৃষ্টির বাইরে যা, তাতেও প্রেম হতে পারে।

প্রেম শব্দ বিশেষভাবে নর-নারীতে চিহ্নিত। তাই প্রেম নিয়ে যে আলোচনাই করা যাক, নরনারী স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়ে। প্রেম শব্দ শুনলেই যেন এক অলৌকিক ভাব এসে পড়ে। বস্তুতঃ লৌকিক ভাব এর সাথে থাকে এক বাস্তবতা, এক স্থূলতা, পাশাপাশি অলৌকিক ভাব এর সাথে থাকে এক অবাস্তবতা এক সুক্ষ্মতা। এই সুক্ষ্ম নিবিড় ভাবই আমাদের  নিয়ে যায় এক অন্য জগতে যে জগতে একজন বলতে পারে আমি সুখী। সুখ শান্তি দাঁড়িয়ে থাকে প্রেমে। প্রেম সেখানে অগ্নিশিখা।

প্রেমের চিঠি / সন্দীপ দত্ত

শরতের কমললতা,

তোমাকে লেখা এই ব্যক্তিগত চিঠিটা নিয়ে আমি প্রতিযোগিতায় নেমেছি বলে রাগ করবে ? আমি বিলক্ষণ জানি, এটা তুমি তোমার ঐ সাধের ঝোলাটিতে কিছুতেই তুলে রাখবে না। কেননা এটা তো আর একান্ত ব্যক্তিগত রইল না। লক্ষ্মীটি, বিশ্বাস কর, এটা নিছকই মজা।  

সত্যি বলতে কি কুমু, আমাদের প্রেমপত্রগুলো তো গড় হিসেবে ঠিক প্রেমপত্র নয়—  এত আটপৌরে, এত অনাড়ম্বর, তাই বেশ কিছুটা মিষ্টি-মিথ্যে আর কিছুটা গোলাপী-নীল কল্পনার আবীর মিশিয়ে চিঠিটা লিখছি। দেখো মিলিয়েউহু, মুখ ফুলিয়ে ঢংবলবে না কিন্তু। ঐ মনো-সিলেবিলিক শব্দটা শুনলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, তা তো তুমি জানোই প্রিয়ে!

শোনো একটা কথা মনে পড়ল হঠাৎ করেআচ্ছা, সবকিছুই কি সংজ্ঞায়িত। নিক্তি-মাপা হতেই হবে। যেমন ধরো অষ্টমীর সকালে যেমন শাড়ি পড়তেই হয়, প্রেমপত্রও কি ভাবরসে চুপচুপে হতেই হবে। আচ্ছা, কেউ যদি রবীন্দ্রসঙ্গীত না শোনে, জীবনানন্দ না পড়ে, ২৫শে বৈশাখেও দিব্যি প্যান্ট-শার্ট পরে চালিয়ে দেয়, তার কি প্রেমের মাঠে খেলবার অধিকার নেই! আজব কথা, কিন্তু কুমু আমি তো জানি আরোপিত জিনিসে তোমার কি আপত্তি। ঠিক যে কারণে তুমি জয়া ভাদুরীতে মুগ্ধ ছিলে, অজয় জাদেজাকে ভালোবাসতে, অজয় দেবগণকে ভালোবাসো, ঠিক সেজন্যই তোমায় আমার এত রাশি রাশি ভালো লাগে সাবলীল, নির্ভার, অনাড়ম্বর অথচ বেঁকিয়ে-চুরিয়ে কথা বলার জড়তা থেকে হাজার হাত দূরে। কমল, তোমার সাথে দেখা হবার পর থেকেই আমি ETv-র টেলিফিল্ম দেখা ছেড়ে দিয়েছিউফ্, সাধারণ বিষয়গুলোকে কি জটিল করে তোলে অনর্থকখবরটা শুনেই এখন চূনী-পান্নাতে চলে যাই! অবশ্য এক বছর পর থেকে ঠিক সাড়ে নটায় ঘরের সব আলো নিভে যাবে (আগামী মাঘের মধ্যে আমাদের বিয়েটা হয়ে যাবে না খুকু!), থাকব আমি-ই তুমি-ই আর, আর . . . . সাঁঝবাতির রূপকথারা। শোনো এবার কিন্তু সুর টেনে কি. . . ই অসভ্য!বলবে না বলে দিচ্ছি, আমি জানি মাঝে-সাঝে একটু-আধটু অসভ্যতা তোমার খারাপ লাগে না! আচ্ছা সরি! সরি! ওক্কে বাবা !!

তুমি চলে যাবার পর থেকে টিউটোরিয়াল-টা একাই চালাচ্ছি, তবে খুব শিগগিরি-ই একজন সায়েন্সের টিচার নিতে হবে। কে জানে,সেই অঙ্কের দিদিমণিটা আবার কেমন হয় ? ‘ম্যায় হু না’-র সুস্মিতা অবধি সামলে নিতে পারব, তবে মেরা নাম জোকার’-এর সিমি গারেওয়ালের মত কেউ এলে কি করব গ্যারান্টি দিতে পারছি না কিন্তু !

তোমার পিতৃদেবের তাকানো-টাকানো গুলো একটু কমনীয় আর নমনীয় হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, আসলে বড় মেয়ে দিদিমণি হয়ে দূর ডুয়ার্সে চলে গেছে বলেই বোধহয়। সেজন্যই মনে হয় কমল মিত্র থেকে পাহাড়ী সান্যাল আপাত ট্রান্সফর্মেশন! অবশ্য নিজের চাকরীরতা কন্যেরতœটিকে কেই বা সেমি বেকার ইতিহাসের টিউটর-এর সাথে বিয়ে দেবার দুঃসাহস রাখে। কি জ্বালা বলতো, সবাইকে কি SSC-PSC পেতেই হবে ?  RICE এর সমিত রায় পেয়েছেবিখ্যাত সত্যদা-মিলনদারা পায় ? — সেরকম ধরো আমিও পেলাম না, তো ? হেসো না, সিরিয়াস; তাতে কি তোমার সামাজিক মর্যাদা এতটুকু কমে যাবে ? কি জানি !

গত  পরশু দিন আবার তোমার প্রিয় হাম দিল দে চুকে সনমদেখলামট্রেনের ভেতরের সেই  দৃশ্যে অজয়-ঐশ্বর্যের অভিনয় দেখে তুমি কেঁদে ফেলেছিলে মনে আছে ? মাঝে মাঝে ভাবি, প্রেম মানে তো একটা টিউনিংঠিকঠাক  Centre  এর সাথে কাঁটা ম্যাচ করলেই আনন্দ, নাহলে পুরোটাই মাথা ধরানো ঘ্যাস-ঘ্যাস এবং বরবাদ।  তোমার সাথে পরিচয়ের আগে ভাবতাম এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে যার সাথে আমার নিজের   ভালোলাগা-মন্দলাগার সরল দোলগতিটা মিলে যায় এবং তার জন্য কোনো বাহ্যিক প্রকাশের প্রয়োজন পড়ে না। কি আশ্চর্য, যখন দেখলাম উৎপল দত্ত বা ওমপ্রকাশের অভিনয় দেখে আমি যতটা আনন্দ পাচ্ছি, সলমন খানের খালি গা দেখে যতটা ঘেন্না লাগছে, যেশু দাস- হরিহরনের গান শুনে যতটা মুগ্ধ হচ্ছি, তিলোত্তমার লেখা পড়ে যতটা আশ্চর্য হচ্ছিপ্রতিটি ক্ষেত্রেই, তোমার উপস্থিতিটা, তোমার কাছে থাকাটা আমাকে আমার ব্যক্তিগত আনন্দিত-বিরক্ত-মুগ্ধ বা আশ্চর্যান্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দিচ্ছে না; তখন বুঝলাম ইহাকেই বোধহয় প্রেম বলিয়া জানে বিশ্ব চরাচর! দুটি আলাদা আলাদা মানুষের নিভৃততম মুহূর্তের, একান্ত নিজস্ব অনুভূতির সাবলীল মিলে যাওয়াটাকেই তো প্রেম বলব, কুমু ?

তুমি কেন এত ভালো, এত নরম কুমু ? কেন এত সংবেদী, এত না বলা কথা কি করে বুঝে যাও বলো তো ? এজন্যই না তোমার ওপর মাঝে মাঝে আমার রাগ হয়, এত ভালো হলে হয় ? এবারে তিস্তা ক্যানেলের ধারে তোমার পাশে বসে থাকার সময় কি জানি একটা কষ্ট গলার মাঝে কেমন যেন দলা পাকিয়ে উঠছিল; আমি জানি না কুমু কেন, বিলিভ মি, আমি জানি না, — অথচ কোনো কারণ ছিল না। পরে ভেবে দেখলামআমি ভয় পাচ্ছি তোমার স্থিতিশীলতাটাকে, আমি ভয় পাচ্ছি আমি মুখে যেই Careless-Casual ভাবটা দেখাই সেটা যে সত্যি নয় সেই আশঙ্কায়, আমি ভয় পাচ্ছি তোমাকে না পাওয়ার একটা অজানা আশঙ্কায়। তার পরে আমি কাঁদলাম কুমু, অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলাম, বহুদিন পর কাঁদলাম, জীবনে প্রথমবার কাঁদলাম কারো পবিত্র বিশ্বাসের ওপর আস্থা রাখতে না পারার আমার মানসিক দুর্বলতার ওপর ক্ষোভে। ওহো ! দ্যাখো আবার আর্ট ফিল্মের চিত্রনাট্য শুরু করেছি! শোনো না, তোমার ঐ যে পাকা বান্ধবীটি আছে নাহ্যাঁ হ্যাঁ, উষসী ( ওটা আসলে উনুন + সাঁড়াশীর যোগফল!!) এত মাতব্বর না, কি বলব ? টিপিক্যাল SUCI করা মেয়েদের চেহারা আর জুন  মালিয়ার মত পেঁচিয়ে কথা বলাঅসহ্য ! সেদিন আমায় বলছে,  ‘সুকু দা, তুমি নাকি ওকে ফোন-টোন করছ না ? নিয়মিত ফোন করবে।’ — ভাবো ! আরে, মেনে নিচ্ছি ও আমাদের অনেক চিঠি চালাচালি করেছে, দুএকবার ওর পিসির খালি বাড়ি ম্যানেজ করে আমাদের প্রেম-ট্রেমও করতে দিয়েছে, তাই বলে সবসময় গার্জেনগিরি ? তোমার ঐ পেয়ারের বান্ধবীটিকে একটু কম আস্কারা দিও; সেদিন আবার দেখলাম ঐ কবি-কবি চেহারার বুম্বার বাইকের পেছনে, যত্তোসব!

ডুয়ার্স উৎসবকেমন লাগল রাত জেগে ভাওয়াইয়া শুনলে নিশ্চয়ই ? তোমার সেতারটা এবার এলে নিয়ে যাবে ? সরস্বতী পূজোয় আসবে তো সোনা ? আসতে তো হবেই আমাদের প্রেমের ঠিক দুটি বছর বয়স যে হবে সেদিন। এবারেও ঐ ময়ূরকন্ঠী নীল শাড়িটি পড়বে তো, যেটায় তোমায় প্রথম দেখেছিলাম। দ্যাখো, কিরকম ক্যাবলা ক্যাবলা আঠারো বছরের প্রেমপত্রের মত লিখছি ! তোমাদের স্কুলে লিপস্টিক বিতর্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কেমন চলছে এই শীতে চপ-মুড়ির সাথে কদিন কমনরুমে ভালোই জমবে না ?

চিঠিটা পড়া হলেই বাঁ হাতে চশমা খুলে ডান হাতে আঁচল দিয়ে কাচটা মুছে বুকের ওপর পড়ে থাকা, পড়তে থাকা দেশটা বালিশের এক পাশে রেখে আলগোছে ঘুমিয়ে পোড়ো লক্ষ্মীটি, ‘পাকিজার মীনাকুমারীর মতো। একটু ফোলা চোখেধরা গলায় না তোমায় ১৯৪২’-র মনীষা কৈরালার মত fresh  অথচ  appealing   দেখায়!
গুণে গুণে ছটা ইয়ে, মানে ঐ ইয়ে রইলো তোমার জন্যে অঙ্কের দিদিমণি!!

              শুধু ভালো থেকো

              Hormonally  yours,
              ইতি শ্রীকান্ত
              ০৬-০২-০৫

বিবর, এপ্রিল ২০০৫। বিবর আয়োজিত প্রেমপত্র লেখা প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চিঠি। পুরস্কার মূল্য:পাঁচশত টাকা। 

প্রেমের চিঠি / স্বপ্ননীল রুদ্র

প্রিয় রাত্রি,

বাড়ি ফিরতেই টানা কয়েকদিনের অন্তর্বিদ্রোহ থেমে গেল; বারান্দায় গুটিসুটি মেরে তুমিপড়ে রয়েছে। সত্যি, আজকাল পিওনগুলো বড্ড বেশী অলস হয়ে পড়েছে। মনে মনে ব্যাটার শ্রাদ্ধ করলাম। অথচ ও জানতেও পারল না যে, ও আমাকে কত বড় পুরস্কার দিয়ে গেল এতগুলো গালি খেয়েও। বেচারা! তুমি তো এখন ঘুমের কোলে। আমি লেপের ভেতর নিজেকে ডুবিয়ে যুদ্ধ করছি নিজের সঙ্গে। চালে হিমপতনের শব্দ হচ্ছে কেমন যেন মন-উদাস করা। টেপডেকে বাজছে মেহেদি হাসানের তনহা তনহা মত্ সোচা কর/ মর যায়ে গা’. . . (পুরো গানটা লিখে পাঠিয়েছিলাম, যাকে তুমি বলেছিলে হাইলি পেনেট্রেটিং)। গজলকে তোমার মতই সঞ্চরণশীল বলে মনে হয় আমার। যেভাবে তোমার প্রকাশভঙ্গিমায় মিশে থাকে প্রাণের টুকুরো, সমর্পণ ও প্রকাশের প্রস্তুতিপর্বগজলের বিষন্নতা, সুরের ব্যাকুল আঘাত তেমনই ভরাট, পরিপূর্ণ। অনেকবার পড়ে ফেলেছি তোমার চিঠিখানা; এখন ঘরময় উড়ছে  তোমার কথামেঘ, গোপন বৃষ্টি শ্লোগান। বুকের ভেতর খালি খালি লাগে। আমার নিঃসঙ্গতা যেন প্রীতিভোজের আয়োজন করেছে। আসবে নাকি ?

ওহো, দেখলে তো ... ংড়ৎৎু, ংড়ৎৎু, বীঃৎবসবষু ংড়ৎৎু, ঢ়ষবধংব ফড়হ'ঃ ংঁষশ বিষন্নতার কথা আর বলব না, আসলে রাত্রি   এতসব যে বলার তাগিদ, কেন ? সেই তো পারস্পরিক উত্তাপে আÍজাগরণ, মনের মনকে সংরক্ষণের কি আন্তরিক প্রচেষ্টা। নয় কি ? জীবনের প্রতিটি পর্ব, প্রতিটি ধাপ, সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রাপ্তির পেছনেচেতন বা অবচেতনেসেই সংরক্ষণের টেনশন নিয়েই তো হাজার হাজার আমি, হাজার হাজার তুমি মুহূর্ত-সময়-কাল চুষে চুষে খায়। বুদ্ধদেব গুহসবিনয় নিবেদনএকটু উষ্ণতার জন্যএর মধ্যেই আবার পড়লাম। এবার নতুন এক উপলব্ধি হল। মনে হল, হৃৎপিন্ডের চেয়ে বড় জুয়া বোধহয় দুনিয়ায় খেলা হয় না। তুমি আবার জানতে চেয়েছো রাত্রি, যে, কতটা  তোমার পাশে আছি। উত্তর দিইনি, আজ বলি, প্রশ্নটা ফবষরনবৎধঃবষু এড়িয়ে গিয়েছিলাম।  অপঃঁধষষু-এর কোন উত্তর নেই আমার কাছে, কিছু মনে কোরো না। তোমাকেও কখনো এধরণের প্রশ্নের জালে পাল্টা জড়াব না। এই বিশ্বায়নের যুগে ভালবাসা মাথার খেলাঈধষপঁষধঃরাব চৎধমসধঃরংস, হৃদয়প্রসূত কাঁপন কই ? কোথায় সেই রঙীন শূন্যতা, যার চরিত্র ন্যাশনাল হাইওয়ের মতন।  যার বাঁকে বাঁকে নিজের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া। এত বাহ্যিক আড়ম্বর যে ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকছে না। 

লাইফ এত ফার্স্ট যে এতদিন কোথায় ছিলেন’-এর মতো নিজস্ব নিরালা নেই। কি লাভ, রাত্রি ? আধুনিক মানুষ তো কামরিরংসাকে প্রেম বলছে। এই তো আজকের প্রেমের সংজ্ঞা, রূপজল ও তেল যে বিন্দুতে এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। যে বিন্দুর কথা বললাম রাত্রি, ঠিক সেখানে তোমাকে বসিয়ে দেখেছি। ঝরসঢ়ষু কষ্ট হয়, খুব, কান ও গাল গরম হয়ে ওঠে। আসলে তুমি মানসিক উর্বরতা। আমার নিজস্ব আয়না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মাঝরাতে কবিতা লিখতে বসে দেখেছিলেন যে সমস্ত শব্দ অক্ষর কমা কোলন ড্যাশ, এমনকি র-এর ফুটকিও ঘুমন্ত নীরাকে লক্ষ্য করে ছুটে যাচ্ছে। অনেক ভেবেছি মাঝরাতে ঝিম মেরে বসে থেকে, আমার তেমন হয় না। কি হয় বলো তো ? আমার বোধ ধারালো হতে হতে একসময় তোমার ঘুমে রূপান্তরিত হই। আর দেখি রাত দুটোর শুনসান পরিবেশে বেশ্যাগলির মুখে বসে থাকা সেই ধবধবে শান্ত বেড়ালটার মতো অদ্ভুত তুমি : বর্ণনা বা ব্যাখ্যার বহুদূরে থেকে আমাকে বোধহীন করে ফেলেছো।

তোমার প্রবাদের মতো লাইনটি, ‘তোমার দুঃখগুলো রান্না করে খাব’— আমাকে আজ আর বোধহয় ঘুমোতে দেবে না। তুমি নিজেও জানো না  কতটা বিশুদ্ধ নারীত্বে ভরে আছে লাইনটি। যেমন সেদিন পৌঁছতে দেরি হল, পাক্কা সাতচল্লিশ মিনিট অপেক্ষা শেষে তুমি ভীষণ শীতল স্বরে, রাগ না করে বলেছিলে, ‘মনে হচ্ছিল জীবন ট্র্যাফিকের কূটিল চক্রান্তে ফেঁসে ছিলরাত্রি, আমার চাওয়া-পাওয়াগুলোর চরিত্র আজকাল ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে। তারা যেন কিরকম হয়ে উঠছেবুঝতেই পারছি না।

পরশু কলকাতায় ইন্টারভিউ, কালই বিকেলের ট্রেনে রওনা হচ্ছি। তারপর দিদির বাড়ি যাব। তোমার জন্মদিনে এবার শুধু কাছছাড়াই নয়, শহরছাড়াও। সেদিন জেগে থেকো, ফোন করব রাত্রি বারোটা এক-এ আর চুপ করে থাকব দীর্ঘক্ষণ। শব্দহীনতার পথে হাঁটতে হাঁটতে তুমি খুঁজে নেবে আমার কথামালা। তোমার জন্য গাঢ় নীলরঙা দামী চুড়ি আনবো, আর দুটো পার্কার পেন।
          ভেজা ভালবাসাসহ
                        তোমার,
                        স্বপ্ননীল

পুনশ্চ : মন্দাক্রান্তা সেনের হৃদয় অবাধ্য মেয়েও আবুল বাশারের স্পর্শের বাইরেউপন্যাস, এবং গুলজারের বৃষ্টি-বিষয়ক গানের সংকলন সৌমনার কাছে রেখে যাব। ওর বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করে নিও।


বিবর, এপ্রিল ২০০৫ । বিবর আয়োজিত প্রেমপত্র লেখা প্রতিযোগিতায়  দ্বিতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চিঠি। পুরস্কার মূল্য : এক হাজার টাকা। 

প্রেমের চিঠি / অমিত কুমার দে

                                                ডুয়ার্স
                                       মাঘের শেষে, ফাল্গুনের অপেক্ষায়


সুচরিতাসু তিস্তা,

কিশোরবেলার সেই নির্মল নীল জল নিয়ে এখনো বহমান রয়েছ কিনা জানি না। এখনো নীল আকাশে চোখ রেখে উদাসী হও কিনাতাও জানা নেই। চুলে সাদা মেঘ খাপছাড়াভাবে উঁকি দিলেও এখনো তোমার জন্য তেমনি কিশোরই রয়ে গেছি। বয়সকে স্থির বিন্দুতে বেঁধে রেখেছি, তোমার মেহেন্দী-আঁকা নম্র হাতে তুলে দেব বলে। অনেকগুলো বছর খন্ড খন্ড কষ্ট, অভিমান আর প্রগাঢ় যন্ত্রণা আমার উঠোনে ফেলে রেখে উধাও। তোমাকে শেষ দেখেছিলাম হালকা আকাশী নীল শাড়িতে। মায়াবী একটা টিপ ছিল দুই ভুরুর মাঝখানে, একটু উপরে। শুকতারার মতো চোখের মণিতে কিছু গাঢ় মায়াবী অনুপ্রাস। তাচ্ছিল্য আর প্রশ্রয় মিলেমিশে কেমন এক বিষন্ন কাব্যও ছিল।

কেমন আছো, তিস্তা ? কেমন চলেছে তোমার ঘরকন্না ? অরুণ মিত্র পড়ো এখনো ? ... ‘ কোথাও কিছু ভিজছে/ না, শুধু তোমার স্বর ছলছল করছে বালি ছাপিয়ে কাঁটার/ আস্তানা ঘিরে। আমি বেলে শিরীষে পা ঘষছি বসছি/নখ দিয়ে মরা মাটি খুঁড়ছি খুঁজছি কোথায় ছুঁই তোমার/গলার স্রোত।’ (এখনো জলের জন্যে/ অরুণ মিত্র)। তোমাকে এখনো বড্ড ছুঁতে ইচ্ছে করে, তিস্তা। রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেলব তুলিতে আঁকা তোমার হাত, বিকাশ ভট্টাচাযোঁর রূপটানে আঁকা তোমার নারীত্ব, যোগেন চৌধুরীর রঙ মাখা শরীর বড় ছুঁতে ইচ্ছে করে, তিস্তা। এখনো কি তোমার পায়ের পাতায় আংরাভাসার পড়ন্ত রোদ এসে আলতা পড়ায় ? এখনো কি তোমার বুকের উদ্ধত্তে ভূটানপাহাড় লজ্জারুণ হয় ? তোমার স্পর্শ এখনো তেমন করেই চাই, তিস্তা। সেই কবে মঞ্জুষ দাশগুপ্তের কবিতা তোমাকে শোনাতেই, লাল হয়ে বলেছিলে . . . .। এখনো সেই কলিগুলো ঠিকঠাক মনে ধরা আছে
          ‘‘ আমার হাত সবটুকু স্পর্শ চায়
          খুলে ফেলো আংটির বাধাটুকুও
          সাপের মিথুন দেখে এসো মাঠে
          শিখে নিও নিবিড়তা কাকে বলে . . .

এখনো কি তুমি বৃষ্টির পদাবলী শোনো তিস্তা ? বুকের ভেতর কল্কল্ জল বয়ে যায় ? এখনো কি ফেরারী মেঘের জন্য ছাদের কার্ণিশে দাঁড়িয়ে বেহিসাবী বাতাসের মতো পাগলী হয়ে ওঠো। আমার কথা ভুলেও কখনো ভাবো, মেয়ে ? অথচ ওই চুলের রহস্যময় সুগন্ধী এখনো গাঢ় হয়ে লেগে আছে। কোথায় ? জানো না তুমি ? জানতে চেয়েছ কোনদিন ? এবার বর্ষায় সব অভিমান শাওনজলে ভাসিয়ে দেবো বলে বসে আছি। গত পরশু হঠাৎ-ই পড়লাম আমার প্রিয় কবি পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা— ‘দুঃখ দিয়েছিলে তুমি/আবার লাইটারটাও দিয়েছিলে। /বোতাম ছিঁড়ে আমাকে নগ্ন করেছো তুমি/ আবার বুনে দিয়েছো নাইলনের সবুজ জামা।/ কমলালেবু নিংড়ে নিংড়ে বানালে সরবত/ভিতরে মিশিয়ে দিলে গোপন কান্নাকাটি/ স্মৃতির পেস্তা-বাদাম।/ সেই সরবত এখন খেতে হবে প্রত্যহ, / বাইশ বছরের যুবকটা যতদিন আমার/চুলের ভিতরে আঁচড়াবে/আগুন রঙের চিরুণি।’’ (দুঃখ দিয়েছিলে তুমি/ পূর্ণেন্দু পত্রী)

হয়তো কবিতা পড়োই না এখন, কিংবা খাপছাড়া পড়তেও পারো, হয়তো কবিতার পৃষ্ঠায় আচমকা আমার মুখ! (এখনো কী দুঃসাহস দ্যাখো!)


          আমাতে আমি ছিলাম, নাকি তোমাতে গেছি মিশে
          সেদিন ? পড়ে মনে ?
          আজও তো আমি পুড়ছি সেই দিনের স্মৃতিবিষে
          কারণে অকারণে।
              (প্রাক্তনী/পবিত্র মুখোপাধ্যায়)

তিস্তা, আমার নদী, আমার মৃত্যু-তটিনী, তোমার রূপকথা কিভাবে পোড়াই ? যতবার সেই অক্ষরবিন্যাসে আগুন দিতে যাই, ততবার নিজেই পুড়ে ছাই।

অথচ, বন্ধু, আমার কথাগুলো কত স্বচ্ছন্দ ছিল; এখনো তোমার বাংলা বইয়ের মলাটের নীচে খুঁজে দেখো, খুঁজে পাবে মহার্ঘ্য চিরকুটকাঁপা হাতে কবিতার মুখ
          আমাকে তোমার কাছে রেখে যেতে চাই।
          যত মতিচ্ছন্ন দিবা, চাঁদকপালী অন্ধকার, ন    দী
          সব তোমার জন্যই রেখে যেতে চাই। . . .
সমরেন্দ্র সেনগুপ্তকে চুরি করে যে কিশোর মেলেছিল মন, সে আজো চৌর্যের জন্য অনুতপ্ত নয়।

তিস্তা, আমার গোপন দুঃখ, তোমার চোখের তারায় এখনো কি লেগে থাকে বৃষ্টিবুনট অভিমান? এখনো কি প্রতীক্ষা করো একটি আচমকা-সাইকেল বেলের ? মধ্য-দুপুরের জানালার শিকে এখনো কি তোমার ঘামভেজা হাতের স্পর্শ ? এখনো কি অপরাহ্নে চা-বাগানের ওই সর্পিল রাস্তা ধরে মনে-মনে হাঁটো ? হেঁটে যাও ?
আমি ভাবতেই পারিনাতোমার দিনশেষের অপেক্ষার আকুল সিঁড়ি বেয়ে মোজাইক মেঝেতে অন্য পুরুষের পা। অথচ তোমার ছোট্ট মেয়েকে আমি মনে মনে আদর করি। ওর জন্য কল্পকথার গল্প বানাই। তোমার মেয়ে কি তোমার মতোই দেখতে হয়েছে ? কি নাম রেখেছ ওর ? তোর্ষা, মহানন্দা নাকি ডায়না ? নদীর মেয়ে তো নদীই হবে, তাই না ?
বয়স গড়িয়ে যাচ্ছে, তিস্তা। শেষপারানির কড়ি শূন্যই থেকে যাবে, তাও জানি। তবু আবেগতাড়িত হই। আমি তোমাকে স্পর্শ করিনি কোনদিন। কোনদিন চোখের পাতায় আঁকিনি কামনার দাগ। কোনদিন শরীর-এর দিকে তাকিয়েও দেখিনি। কারণতোমার দিকে তাকালেই আমার চেতনায় পবিত্র ধূপের গন্ধ.... মাঙ্গলিকী... স্বর্গমাধুরী....।  তোমার একটি ছবি আমার কাছে নেই। অথচ পাঁচ হাজার অ্যালবাম তোমার ছবিতেই ভরা ! একমাত্র আমিই দেখতে পাই, তুমি হাঁটছো, বসে আছো, ঘুমোচ্ছো, আবার কাঁদছোও। অথচ তোমায় ছুঁতে পারিনা, তিস্তা।
গতকাল হঠাৎ-ই পড়লাম আবু কায়সার-এর কবিতা। ওপার বাংলার। উনি কিভাবে আমার কথা জানলেন ?

          আমি তো ভালো অনুবাদক নই
          তোমার মুখ আঁকতে গিয়ে সই
          আপন বর্ণ আপন বর্ণমালা
          তাতেই গাঁথি বিনে সুতোর মালা।
          গ্রাম্য পথ, কর্দমাক্ত ঘাটে
          তোমাকে নিয়ে পড়েছি বিভ্রাটে।

     ভালো থেকো। সবাইকে ভালো রেখো।

              ইতি
              তোমার . . . . . . . .।


বিবর, এপ্রিল ২০০৫ । বিবর আয়োজিত প্রেমপত্র লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার প্রাপ্ত চিঠি। পুরস্কার মূল্য : দেড় হাজার টাকা। 

September 2, 2014

গল্প / একটি হৃদয় একা / অঞ্জন কুমার দাস

অগোছালো নরম স্মৃতির গভীরে জেগে উঠতে থাকে, জন্ম নিতে থাকে সোনালী কিছু মুহূর্ত। আর উড়ে যায় ধুলোর মত অনেক কিছু যা একদিন প্রিয় ছিল। মুছে যাবার আগে আবছা বেদনাবোধ জাগিয়ে তোলে হৃদয়ে। মনের অতলে ও হৃদয়ের স্পর্শে গড়ে তোলে দুঃখবোধের এক নির্মাণশিল্প। এই দুঃখের কাছে অনির্বাণের চিরকালের ঋণ। এর মধ্যেই অনির্বাণ এক নিজস্ব জগৎ গড়ে তুলেছে। কাউকে টের পেতে দেয় না এই একাকী দুঃখবোধের জগৎ। এ তার নিজস্ব একক নির্মাণ। একক আহ্লাদ।

অনির্বাণ প্রাচীন টেলিফোন পোষ্টটির আশ্রয় তারটির গায়ে আয়েশ করে  হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। এখানে তার সারাদিনের ক্লান্তি ঝড়ে যায়। সে ভাবতে থাকে এই বয়ে বেড়ানো জীবনে সে কি পেয়েছে! এই জীবনের মানে কি ? অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নিজের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে কতকগুলি যুক্তি দাঁড় করিয়ে খেলতে থাকে। কিছুটা মেলে। কিছুটা  মেলে না। কখনো উৎসাহিত হয়। কখনো মনে হয় উপড়ে ফেলি এই জগতের সব। সবকিছু। আবার প্রথম থেকে সাজিয়ে সুন্দরতর করে গড়ে তুলবে এই পৃথিবী। এই ভাবনা অনির্বাণকে দ্বিধার মধ্যে রাখে সর্বক্ষণ। কিন্তু এই দ্বিধা ভেঙে কোন পথ তৈরী হয় না।

July 28, 2014

প্রেম, স্বাধিকার ও স্বপ্নভঙ্গ / তপন কুমার দাস

তপন কুমার দাস
মোবাইল : 94343880810
বিবরের চিঠি পড়ে জানলাম, প্রেম সম্পর্কে কিছু লিখতে হবে। প্রেমের গল্প লিখেছি, কিছু কবিতাও, আমার নানা প্রবন্ধে প্রেম, নারী, পুরুষ ইত্যাদি প্রসঙ্গও বার বার এসেছে, কিন্তু এবার শুধু প্রেম নিয়েই কিছু লিখতে হবে ! এই ধরাধামে কী এমন কেউ আছেন যে কখনো কোন না কোন ভাবে প্রেমে পড়েননি ?  ইস্কুলীয় প্রেম, কলেজীয় প্রেম, য়্যুনিভার্সিটিয় প্রেম, আপিসীয় প্রেম, সাংসারিক প্রেম - প্রেমের কত না রূপ আর অভিমুখ! কিন্তু প্রেমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবতঃ এর ‘সফলতা’ বা ছেদহীন পরিণতি। প্রেম যখন প্রাক-বৈবাহিক পর্বে সুন্দরী ঝর্ণার মতো উপল-বিক্ষুব্ধ হ’য়ে নিচে নেমে আসে তখন তার মাধুর্য্য ও আবেশের কথা ভাবাই যায় না, কিন্তু যেই সেই চলচপলা সমতলের কাদামাটি স্পর্শ করল তখনই সে যেন পৃথুলা হ’য়ে পড়ল। জীবনের যাবতীয় নান্দনিক সঞ্চয় উভয়পক্ষ এমনভাবে ভুলে গেল যে ভাবাই যায় না ওরা একদিন পাখির কুজনে আকৃষ্ট হ’তো, গাছের পাতার খস্খস্ শব্দে চমকিত হ’য়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করতো, জীবনের যে কোন বিসঙ্গতিই ছিল কৌতুকের কিংবা কয়েক পলকের অদর্শনও ছিল যেন তীব্র যন্ত্রণার। কিন্তু এসব গেল কোথায় রে বাবা! তা হ’লে এসবই কী ছিল সময়ের ভান, ওস্তাদের কেরামতি ? কেয়া বাত . . . কেয়া বাত ?

প্রবন্ধ : প্রেম, সভ্যতার বিম্বিত অভিমুখ / অঞ্জন কুমার দাস

অঞ্জন কুমার দাস
মোবাইল : 9832078595
প্রমিথিয়ুস  যেদিন মানুষের জন্য এনে দিয়েছিল আগুন, সেই শুরু সভ্যতার বলিষ্ঠ পথচলা।  তারপর মানুষ এগিয়ে নিয়ে চলেছে সভ্যতার চাকা নতুন নতুন পথ দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রিকতায়। এই আগুন জ্বালাতে শেখাই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে নতুনতর জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে। এই সংগ্রামী এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কোন এক অবসরে তার মস্তিষ্কে জাগ্রত হয় এক অনির্বচনীয় নক্ষত্রের আভাস। দুটি শরীরের ভিন্ন মাত্রিক আকর্ষণ পরস্পরকে প্রবল আকাঙ্খার সন্ধান দিল। যৌনতার স্বাদে সে প্রথম অনুভব করল ঈশ্বরকে। সে চিনতে শিখল কামের স্বরূপ। কামই আদি রিপু। সভ্যতার মূল প্রাচীন সত্য। এই কাম  থেকে প্রেমের সিঁড়িতে উত্তরণ ঘটতে বহুকাল সময় লেগেছে।